আমাদের শরীরকে একটি জটিল এবং সচল যন্ত্রের সাথে তুলনা করা যায়, আর এই যন্ত্রটিকে দিনরাত নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখার মূল জ্বালানি হলো রক্ত। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে সাধারণত ৫ থেকে ৬ লিটার রক্ত থাকে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই রক্ত আমাদের শরীরে ঠিক কী কাজ করে এবং কেন এটি ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব?
আজকের ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় জানবো মানবদেহে রক্তের প্রয়োজনীয়তা ও এর মূল কাজগুলো সম্পর্কে।
কোষ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ
আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, তা ফুসফুসে গিয়ে পৌঁছে। রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় (Red Blood Cells) থাকা ‘হিমোগ্লোবিন’ নামক প্রোটিন এই অক্সিজেনকে গ্রহণ করে এবং হৃদপিণ্ডের পাম্পিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষে পৌঁছে দেয়। অক্সিজেন ছাড়া শরীরের কোনো কোষ বা অঙ্গ কাজ করতে পারে না।
পুষ্টি উপাদান পরিবহন
আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা পরিপাক বা হজম হওয়ার পর বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদানে (যেমন: গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ) পরিণত হয়। রক্ত এই পুষ্টি উপাদানগুলো পরিপাকতন্ত্র থেকে সংগ্রহ করে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে ছড়িয়ে দেয়, যা আমাদের শক্তি ও বৃদ্ধি জোগায়।
ক্ষতিকর বর্জ্য নিষ্কাশন
শারীরিক নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলে কোষে কোষে নানা ধরণের ক্ষতিকর ও বিষাক্ত বর্জ্য (যেমন: কার্বন ডাই অক্সাইড, ইউরিয়া ও ইউরিক অ্যাসিড) তৈরি হয়। রক্ত এই বর্জ্যগুলো সংগ্রহ করে বের করে দেওয়ার জন্য ফুসফুস, কিডনি ও ত্বকে নিয়ে যায়।
রোগ প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা
রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells) শরীরের প্রাকৃতিক প্রহরীর মতো কাজ করে। বাইরে থেকে কোনো ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ক্ষতিকর জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে শ্বেত রক্তকণিকা তার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের রোগমুক্ত রাখে।
রক্তপাত বন্ধ করা (রক্ত জমাট বাঁধা)
শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে বা আঘাত পেলে রক্তের অণুচক্রিকা (Platelets) বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এটি ক্ষতস্থানে দ্রত রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে, যাতে শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্ত বের হয়ে জীবন বিপন্ন না হয়।
শরীরের তাপমাত্রা ও হরমোন নিয়ন্ত্রণ
রক্ত পুরো শরীরে সঞ্চালিত হয়ে শরীরের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট (সাধারণত ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরের নানা এনডোকোরাইন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোনগুলো নির্দিষ্ট অঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার কাজও রক্তই করে থাকে।
শেষ কথা
সহজ কথায়, অক্সিজেন সরবরাহ, পুষ্টি জোগানো, রোগ প্রতিরোধ এবং বর্জ্য পরিষ্কারের মাধ্যমে রক্ত আমাদের প্রতিনিয়ত বাঁচিয়ে রাখছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা, জটিল অস্ত্রোপচার কিংবা থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগের চিকিৎসায় যখন রক্তের অভাব দেখা দেয়। তখন অন্য একজন মানুষের দান করা রক্তই হতে পারে মুমূর্ষু রোগীর শেষ সম্বল।
“আপনার রক্তদান, বাঁচিয়ে দিতে পারে একটি পুরো পরিবার।”








